ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বাকেরগঞ্জে দোয়া-মিলাদের মঞ্চে নৃত্য, কোরআনের ছবি ঘিরে বিতর্ক

  • প্রতিনিধির নাম : | নিউজটি দেখেছেনঃ 274 জন
বাকেরগঞ্জে দোয়া-মিলাদের মঞ্চে নৃত্য, কোরআনের ছবি ঘিরে বিতর্ক ছবির ক্যাপশন:
ad728
বাকেরগঞ্জে দোয়া-মিলাদের মঞ্চে নৃত্য, কোরআনের ছবি ঘিরে বিতর্ক


বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি:

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৪ নম্বর দুধল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুন্দরকাঠি নগর মোল্লারবাজার এলাকায় রাষ্ট্রপতির নাম ব্যবহার করে আয়োজিত দোয়া, মিলাদ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনুষ্ঠানের ব্যানারে পবিত্র কোরআন শরিফ ও জাতীয় পতাকার ছবি ব্যবহার করা হলেও একই মঞ্চে পরে নৃত্য পরিবেশন করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহিন মোল্লাকে নর্তকীর সঙ্গে নাচতে এবং পকেট থেকে টাকা বের করে বখশিস দিতে দেখা যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ ও ৪ অক্টোবর সুন্দরকাঠি নগর মোল্লারবাজার এলাকায় ‘রাষ্ট্রপতির শপথ ও দেশের সার্বিক মঙ্গল কামনায় দোয়া, মিলাদ ও দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’ আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের ব্যানারে পবিত্র কোরআন শরিফ ও জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের ব্যানার টাঙানো অবস্থাতেই মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। এ নিয়ে ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে এ ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দোয়া ও মিলাদ ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। পবিত্র কোরআন কোনো সাজসজ্জার অনুষঙ্গ নয় এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানও বিনোদনের মাধ্যম নয়। সাংস্কৃতিক আয়োজন আলাদাভাবে করা যেত বলেও তারা মন্তব্য করেন।

স্থানীয়দের কেউ কেউ আরও বলেন, এত বড় আয়োজন পূর্বপরিকল্পিতভাবেই হয়েছে। ফলে অনুষ্ঠানের আগে স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রশাসনের বিষয়টি তদারকি করা উচিত ছিল।

বিভিন্ন মহলের বক্তব্য

মোহাম্মদ আবু তালেব বলেন, “দোয়া ও মিলাদ মাহফিল একটি ধর্মীয় আয়োজন। সেখানে ধর্মীয় পরিবেশ ও ভাবগাম্ভীর্য বজায় থাকা উচিত। একই অনুষ্ঠানে নাচ-গানের আয়োজন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।”

ইব্রাহিম বলেন, “কোনো শিল্পী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিচয় আমাদের আপত্তির বিষয় নয়। বিষয়টি হলো, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে কী ধরনের আয়োজন করা হচ্ছে। বিশেষ করে পবিত্র কোরআনের ছবি ব্যবহার করা হলে আয়োজকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।”

এ বিষয়ে দুধল দরবার শরীফের পীর সাহেব মুফতি শাহ মো. সাইফুল্লাহ বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমরা জানি না। আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম।”

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাকেরগঞ্জ উপজেলা পশ্চিম শাখার সভাপতি রোকন ডাকুয়া বলেন, “আমরা এ বিষয়ে জানি না। তবে বিষয়টি সম্পর্কে জেনে আপনাদের জানাব।”

‘গর্বের বাকেরগঞ্জ’-এর সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন মোহন বলেন, “দোয়া-মিলাদের মতো পবিত্র ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে নাচ-গানের এমন প্রদর্শনী এবং তার সঙ্গে পবিত্র কোরআনের ছবি ব্যবহার অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এটি শুধু রুচির প্রশ্ন নয়; ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সামাজিক শালীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।”

তিনি আরও বলেন, “কোনো শিল্পী বা কোনো মানুষের পরিচয় আমাদের আপত্তির বিষয় নয়। আপত্তি হলো ধর্মীয় পবিত্রতাকে এমন উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা, যা তার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। ভবিষ্যতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সংযত, দায়িত্বশীল ও সচেতন হওয়া উচিত।”

বাকেরগঞ্জ উপজেলা আনন্দ টিভির প্রতিনিধি ও সমাজসেবক বাইজিদ বাপ্পি বলেন, “রাষ্ট্রপতির মঙ্গল কামনায় দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের ব্যানারে পবিত্র আল-কোরআনের ছবি ব্যবহারের পরও এ ধরনের নাচ-গানের আয়োজনের নিন্দা জানাই।”

তিনি আরও বলেন, “ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নাম ও পবিত্র প্রতীক ব্যবহার করা হলে এর পবিত্রতা, শালীনতা ও ভাবগাম্ভীর্য রক্ষার দায়িত্ব আয়োজকদেরই। দোয়া-মিলাদ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আলাদা—দুটিকে একসঙ্গে উপস্থাপন করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেটিই এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন।”

বিএনপির প্রতিবাদ

এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর দুধল ইউনিয়ন বিএনপি এ অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে।

দুধল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মকবুল খান বলেন, “ইউপি সদস্য শাহিন মোল্লা দলের সদস্য পদসহ কোনো পদে নেই এবং কখনো ছিলেনও না। এ অনুষ্ঠানের বিষয়ে ইউনিয়ন বা উপজেলা বিএনপির কারও কাছ থেকে শাহিন মোল্লা অনুমতি নেননি। এ ব্যাপারে ইউনিয়ন বিএনপির পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”

দুধল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন রিপন খান এক বিবৃতিতে বলেন, “৪ নম্বর দুধল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুন্দরকাঠি মোল্লারবাজারে দোয়া, মিলাদ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের যিনি আয়োজক, তিনি দুধল ইউনিয়ন বিএনপি বা এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো সদস্য নন। আমরা দুধল ইউনিয়ন বিএনপি এসব অসামাজিক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ইতোমধ্যে প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে এবং প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।”

পুলিশের বক্তব্য

বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আদিল হোসেন জানান, রাষ্ট্রপতির নাম ব্যবহার করে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানের জন্য থানার পক্ষ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। অনুষ্ঠানের বিতর্কিত কিছু কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছে।

এদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জড়িত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের অনেকে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রাখতে এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন তারা।

তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি এবং মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। আয়োজকদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে

নিউজটি পোস্ট করেছেন : স্বদেশ সময়

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা ও প্রবীণ সাংবাদিক জালাল উদ্দীন আর নেই

ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা ও প্রবীণ সাংবাদিক জালাল উদ্দীন আর নেই